বাবু সমিত্র নীলাকার। নামের মধ্যে যেমন একটি ভরের অস্থিত্ব অনুভব করা যায় কাজের বেলায় সাংঘাতিক অকেজো প্রকৃতির লোক। বেসরকারি অফিসে একজন দপ্তরীর কাজ করে সংসার চালায়। কাজের বেলায় লোকটিকে কোথায় খুজে পাওয়া যায় না, আলসেমিতে বেশী সময় কাটিয়ে দেয়।
নীলাকরের বিশাল নামটা কেটে অফিসের কর্মচারীরা তাকে 'নীল' বলে ডাকে। 'নীলু' কিংবা 'নীলা' ডাকার ফলে মহিলা নামের একটা সংকোচ ভাব থেকে যায়। ওটা এড়ানোর জন্যে সবাই তাকে 'নীল' বলে ডাকে।
নীলাকারের কাছে ম্যানেজার থেকে দু'একবার সাবধানবানী এসেছিল। তার বেতন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। যার নিষ্ঠুরতার ভোগ পোহাতে হচ্ছিল নীলাকরের সংসারে থাকা দশ বছরের সন্তান এবং স্ত্রীকে।
এরপর থেকে বাবু নীলাকর কাজে মনোযোগ দেওয়া শুরু করে। শুধুমাত্র তার পরিবারের কথা চিন্তা করে। কাজের চাপ বুঝতে পেরে ম্যানেজারের সাথে কথা বলে মাইনে বাড়ানোর নিস্ফল আবদন করে। ম্যানেজার তাকে অনেক আগে থেকে চেনে। তার কাজের ধীরতা আগ থেকে টের পেয়ে মাইনে বাড়ানোর চিন্তা ভুলে গিয়ে উল্টো নীলাকারকে নতুন চাকরী খোজার সুপারিশ করল।
এদিকে নীলাকর মর্মাহত হয়ে অফিসের খবর পরিবারকে জানলে, স্ত্রী রীতিমত রেগে গিয়ে জানিয়ে দেয় যে এক মাসের ভেতর যদি কোনরূপে মাইনে বাড়াতে না পারে তবে ঘর ছেড়ে দিয়ে পিত্রালয় যাত্রা করবে।
স্ত্রী রেগে যাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। ঘরে খাবার কেনা-ছেলেটার স্কুলের ফি দেওয়া-মাসে মাসে বিদ্যুৎ এর বিল,বালা কেনার খরচ ছাড়াও যাবতীয় বাদবাকি খরচ একজনের পক্ষে এতকিছু টানা সম্ভব নই যখন দেখা যায় ঘরের কর্তার মাইনে খুবই স্বল্প পরিমানের।
নীলাকর কিছু বুঝতে পারে না,কি করবে। রাতভর ঘরের বাইরে জেগে জেগে সিগারেট এর স্ফুলিঙ্গ উড়াতে থাকে। এরপর নীলাকর সব জায়গায় চাকরীর আবেদন করে দেখে। স্ত্রীর এক মাসের সময় খুব শীঘ্রই ফুরাতে শুরু করে।
একদিন গভীর রাতে বাসায় যাওয়ার পথে নীলাকরের সাথে এক যোগীর সাথে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। চাটাই পেতে এক বিশাল বটগাছের নিচে বসেছিল। আনমনে ধ্যান করে যাচ্ছিল। যোগীর পরনে ছিল লাল রঙের একটি লম্বা কাপড় যা পুরো শরীরজুড়ে পেচানো ছিল। মাথায় গুচ্ছভর্তি উস্ক-শুষ্ক চুল। মুখে রং মাখা এবং মাথায় ছিল বেশ বড় টিকা যার ফলে চেহারার আভাস বুঝা যাচ্ছিল না।
নীলাকর পাশে যেতেই হুট করেই যোগী তার রাঙা দুটি চোখ খুলে বসল। নিলাকর প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিল, স্বাভাবিক হয়ে ফিরে যোগীকে জিজ্ঞাসা করল সে এখানে কি করছে।
যোগী জবাব দিল না। নীলাকর এভাবে তার পরিচয় জানার চেষ্টা করল। যোগী তার কোন কথার উত্তর না দিয়ে বলল, '।
নীলাকর যোগীর চরনের বিন্দুমাত্র বুঝতে পারল না। বুঝার উচিতও ছিল না ভেবে আস্তে করে পাশ কেটে চলে যেতে লাগল। লোকটি যোগী বেশে পাগল হতে পারে, নীলাকর ভাবতে লাগল।
যোগী একই চরন সশব্দে আবার বলতে লাগল।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নীলাকর গতরাতের ঘটনাকে স্বপ্ন ভেবে তুমুলভাবে নিঃশব্দে হাসতে লাগল। ঘুমকাতুরে ছেলেটিকে দেখে থেমে গেল।
নীলাকর ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আফসোস করতে লাগল। অসহায় বাবা হয়ে ছেলেটির গায়ে হাত বুলিয়ে স্নেহ দান করে বলল,'আর কিছুটা সময় দে, তারপর তুই যা যা স্বপ্ন দেখছিস তা সবটা আমি পূরন করব'।
নীলাকর জীবন বদলানো না। কর্মচারীদের কথা শুনে পত্রিকায় চাকরী খোজ দেয়। রুটিন মাফিক প্রতিদিনের অফিসে বকাঝকা এবং কাজে কিছুটা ভুল হলে চাকরি ছাড়ার নির্দেশনা চলতে থাকে। এইগুলো নিয়ে তার দু-একদিন এভাবে কাটছিল, কিছুই বদলালো না। নীলাকারের জীবন নিরানন্দ থেকে গেল।
রাতে বটগাছের পথটা দিয়ে যাওয়ার সময় কাউকে দেখতো না। পথে যাওয়ার সময় অনেক উদ্ভট খেয়াল জেগে উঠত। মাঝেমাঝে ভাবত,যদি আবার কোন তপস্বী-ফকিরের দেখা পেলে বেশ ভাল হতো। সে রাতে নীলাকারের চলে যাওয়াটা ভুল মনে করল।
এক সকাল বেলা তাড়াহুড়ো করে বাস ধরে অফিসের দিকে রওনা হচ্ছিল। রাতে জেগে থাকার ফলে ঘুম থেকে দেরী উঠতে হলো। অফিসে কি প্রকারের ঝাড়ি খাবে সারাটাপথ চিন্তা করতে লাগল।
কিছুক্ষন পর নীলাকর খেয়াল করল, যে বাসে চড়ে যাত্রা করছিল সেই বাসটি হালকা দোলতে শুরু করছে। এটা স্বাভাবিক দোলানো ছিল না। বাসের কোনো যাত্রী খেয়াল করল না অথচ নীলাকর ব্যাপারটি বুঝতে পেরে বাসের জানালা দিয়ে সাবধানে মাথা বাইরে বের করে চাকার পর্যবেক্ষণ করে নিল।
নীলাকরের ধারনা সঠিক ছিল। এরপর ঘটনা সবাইকে জানানোর পর, ধাপে ধাপে কাজ করে একটা বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া গেল। গাড়ির চাকার স্ক্রু আলগা ছিল বলে এ সমস্যা হচ্ছিল। অবশেষে নীলকরকে সবাই ধন্যবাদ জানালো।
নীলাকর খুশি হয়ে খবরটা তার স্ত্রীকে জানালো এবং স্ত্রী খুশি হয়ে গোটা পাড়া ছড়িয়ে দিলো।
কাজের প্রেশার বেড়ে যাওয়ার কারনে নীলাকরের রাতে ঘুম ভাল হয় না। সারারাত জেগে ভাবে যে আগামী দিনটা কীভাবে শুরু করবে। চিন্তা করতে করতে সিগারেটের প্যাকেট শেষ করে দেয় তবুও চিন্তার শেষ নেই।
নেশা জিনিসটি বড়ই ক্ষতিকর। সিগারেট ছেড়ে দেওয়ার পণ নীলাকার অনেক আগেই করেছিল। ছাড়তে পারে নি। এদিকে অযথা টাকা খরচও চলছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিবারকে নিয়ে কখনো খুশি থাকা যাবে না।
অর্ধাঙ্গিনীর দেওয়া এক মাসের কিছুটা সময় এখনো বাকি আছে। মনে হচ্ছে শেষটুকু আর সম্ভব হবে না। ছোটকাল যদি পরিবারের শাসন শুনে ভাল করে পড়ালেখা করত তবে আজ এইদিন দেখতে হতো না।
শেষরাতে বিছানায় শুয়ে পাখার ঘুরন্ত দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে ঘুম আসল টের পেল না। ঘুম ভাল চলছিল। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে তীব্র যন্ত্রনা শুরু হলো। ব্যাথার ঘোর মাথা থেকে শুরু করে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। চোখ খুলা যাচ্ছিল না। পাশে শুয়ে থাকা স্ত্রীকে ডাকার চেষ্টা করে যাচ্ছিল কিন্তু মুখ থেকে শব্দ বের করতে পারল না। বহুক্ষণ পর চোখ খুলে চারদিকে মেলে তাকালো।
নীলাকারের সামনে একটা অপরিচিত মহিলা,চারপাশটা অপরিচিত জায়গা। নীলাকারের মাথায় ব্যান্ডেজ। কপাল ফুলা ছিল। শরীর নড়াতে পারছিল না। পাশে যে মহিলাটা ছিল সেটি ভৌ দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে কোথায় যেন চলে গেল।
নীলাকার কিছু বুঝে উঠার আগে দেখতে পেল দরজা খুলে স্টেথোস্কোপ পরা লোকের সঙ্গে মহিলাটার পুনরায় প্রবেশ। দরজার এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল তার স্ত্রী এবং সহকর্মী আবু তাহের।
নীলাকার,স্ত্রীকে দেখতে পেয়ে কিছুটা স্বস্তির শ্বাস ফেলল। স্ত্রীর কাছ থেকে পরে সব জানতে পারল। অপরিচিতা মহিলাটা নার্স ছিল এবং লোকটি ছিল ডাক্তার। গতরাত না-কি নীলাকারের মাথার উপর পাখা পড়ে গিয়েছিল। গভীর রাতে রক্তাক্ত শরীরটা ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসতে তাহের সাহায্য করেছিল। তাহেরের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা দরকার। তাহের জানালো, অফিস থেকে খবরটা জানার পর ম্যানেজার না-কি মন থেকে কিছুটা আহত হলো এবং কি যেন ভেবে তাকে কিছুদিনের ছুটির সাথে কিছু টাকাও পাঠিয়ে দিল। ম্যানেজার এমন কিছু করে বসবে নীলাকারের অজানা ছিল।
নীলাকার হতভম্ব হয়ে পড়ল। বৃত্তকারের রচনা এভাবে ভারী হয়ে পড়বে জানত না। নীলাকার তার স্ত্রীকে কাছে ডেকে নিজ ছেলেটাকে খুজতে লাগল। স্ত্রী আশ্বাস দিল পাশের বাড়ির বুয়াকে নিয়ে বাসায় নিরাপদে আছে।
বর্ষার সময়। সকাল থেকে গুড়ো গুড়ো বৃষ্টি পড়ছিল। নীলাকারের শরীর অবস্থা ততক্ষনে ভাল। কেবল হাতে নড়াতে কষ্ট হচ্ছিল। স্ত্রীকে না জানিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় হাটতে শুরু করল। আজকে ভিজতে মন চাইছে । শরীরে বৃষ্টির ফোটা পড়তেই শিহরণ অনুভূত করতে লাগল।
হেটে হেটে নীলাকার বটগাছের নিচে দাঁড়ালো। গাছটির অপর পাশে ছিল খেলার মাঠ। ছোট ছোট বাচ্চাগুলো কাদাতে ফুটবল খেলাতে মেতে উঠছিল।
নীলাকার সেই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে একবার যোগীর সাথে দেখা করেছিল। নীলাকার ওই রাতের কথাগুলো পুনরায় ভাবতে লাগল। ওই চরনগুলো আবার ভাবতে থাকল। চিন্তার মাঝে আনন্দ পেতে লাগল।
নীলাকার হঠাৎ রুখে গেল। চিন্তা ধারাকে একটু পিছিয়ে নিতে সে অবাকভাবে যোগীর চরন স্মরন করার চেষ্টা করতে থাকল। মাথায় চিন্তা আসার পর হৃদস্পদন ধুক কেপে উঠল।
'যোগীর কথা কি আসলেই সত্যি ছিল?', নীলাকার ভাবতে লাগল। 'এই গত কয়েদিন যাবৎ যে দুর্ঘটনা পেরিয়ে এসেছি তার মূলেই রয়েছে 'বৃত্ত'! বাসের চাকা এবং পাখার মাথাটিও ছিল 'বৃত্তকার'।
নীলাকারের যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। সে ভয় পেতে লাগল এবং আশেপাশে বৃত্তের খোজ করতে লাগল। যেকোন মুহূর্তে এবং যেকোন প্রকারের গোলাকার জিনিস তাকে এড়াতে হবে।
নীলাকার থ হয়ে বাচ্চাদের ফুটবলের উপর লক্ষ করল। 'এই ফুটবলটিও গোলাকার। তবে এটার সাথে বিপদের কি সংযোগ হতে পারে?', নীলাকার বলল। নীলাকার নিজের ভুল-ভ্রম ভেবে মুচকি দিল।
এমন সময় ফুটবলটি মাঠের পূর্ব দিকের খাদে পড়ল। বৃষ্টির পানিতে ভরে যাওয়ার কারনে বলটি সেখানে পড়ে ভাসতে থাকল। নীলাকার স্পষ্টভাবে লক্ষ করল বৈদ্যুতিক পাইপ থেকে একটি তার ছিটকে এসে সেখানে ডুবে ছিল। নীলাকার বুঝতে পারল তারটি যদি সচল থাকে তবে যেকোন মুহূর্তে অমঙ্গলজনক কিছু ঘটে যেতে পারে।
নীলাকার ভাবল আগে থেকে ছেলেদের সাবধান করে দেওয়া উচিত। যেই চিন্তা সেই কাজ।
প্রথমে নীলাকারের কথা কেউ বিশ্বাস করছিল। এরপর পাড়ার জ্ঞাত বড়জন কাউকে বলার পর ব্যাপারটা নিরিখ করে বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারল।
সকলে নীলাকারকে প্রশংসা করল। নীলাকারের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ব্যাপারটা এতোই সাংঘাতিক ছিল বটে যার জন্যে খবরটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এলাকার বিভিন্ন পদের বড় সর্দাররা নীলাকারের বাসায় এসে তাকে একবার করে দেখে গেল।
কবির হাতে পেপার নিয়ে বসল। নীলাকারের গুঞ্জন অনেকদিন যাবৎ কানে আসার পর সে নড়েচড়ে বসল। ব্যাটা অনেকদিন ধরে এসব খবরের অভাবে গলা শুকিয়ে খা খা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কবির পেশায় জার্নালিস্ট। রোমাঞ্চকর খবরের জন্য কখনো এ অঞ্চলে বা কখনো ওই অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়। পত্রিকায় বিভিন্ন আর্টিকেল লিখে দিন রোজগার হয়। কবির, গুজব খবর ছাপিয়ে মন থেকে কখনো খুশি হতে পারত না। মিথ্যে খবর ছাপাতে ছাপাতে হৃদয়ের ফাঁকফোকর গুলোতে মরিচিকা ধরতে শুরু করল। নীলাকারের বিষয়টা অগ্রাহ্য করা যায় না।
এক বিকেলে কবির নীলাকারের সাথে সাক্ষাৎ করতে যায়। সেই শেষ ঘটনার আজ ফুমাস পার হলো। অনেকদিন পর নীলাকারের সাথে কেউ সাক্ষাৎ করতে এলো।
নীলাকারকে বাসায় পাওয়া গেল না। তাকে খুজতে খুজতে কবির খেয়াঘাটে চলে আসল। নীলাকার আপন বিলাসে চোখবুজে পাড়ে শুয়ে ছিল।
কবির নীলাকারকে চেনার পরও না চেনার ভান ধরে বলল,'আপনি কি সমিত্র নীলাকার সাহেব? '
নীলাকার সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে ফেলল। মনে হচ্ছিল ঘুমটা সবেমাত্র এসেছিল। বিরক্তির আভাস দেখিয়ে বলল,'আপনি কে, কেন খুজছেন আমাকে?'
'তাহলে আপনিই নীলাকার সাহেব।'
'হ্যা,আমি নীলাকার। কি কাজ?'
'আমি শুধু আপনাকে দেখার খাতিরে আসিনি। আপনার সাথে দু-একটা কথা বলেই চলে যাবো। যদি আপনি বিরক্তবোধ না করেন।'
'কি বলবেন বলেন।'
কবির নীলাকারের পাশে বসেত বসতে বলল,'আশা করি, আমার কথাগুলো শুনে আপনার ভাল লাগবে। আপনি সেদিন বাচ্চাগুলোকে বাচিয়ে অনেক বড় উপকার করেছিলেন।'
'এটা নতুন কথা কিসের। এবারের মত ষাটবারের মত একথা শুনে আসছি। নতুন কিছু বলার থাকলে বলেন।'
কবির সামান্য হেসে আবার বলতে লাগল,'মানুষ হিসেবে আপনি মহৎ কাজ করে গেলেন। তবে একটা কথা বলব। এলাকার মানুষ যেটা খেয়াল করেনি সেটা আমি লক্ষ করেছি।'
'যেমন?'
'যেমন, সেই ঘটনার আগেও না-কি আপনার সাথে এমন উদ্ভট সব কান্ড ঘটত। আপনি অন্যদের সাহায্য করতে যেতেন বটে কিন্তু স্বয়ং নিজ জীবনে আনন্দের মুহূর্তগুলো থেকে বিতাড়িত থাকতেন।'
নীলাকার রহস্যময় চোখে একবার চেয়ে নিল। তারপর বলল,'আপনি কে? আমার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আপনার এতো ধারনা কেমনে এলো?'
কবির এবার হেসে ফেললো। কবির উৎসুকভাবে বলল,'আমি একজন জার্নালিস্ট। খবর পাতায় লেখালেখি করি। মানুষের জীবন আমরা সহজে তুলে ধরতে পারি। আমাকে ভুল ভাববেন না। আমি আপনার জর্জরিত জীবনের উপর তামাশা করতে আসিনি। বরং সুসংবাদ নিয়ে এসেছি।'
নীলাকার বলল,'কেমন সুসংবাদ?'
কবির বলল,'আমি জানি, আপনি চাকরি হারিয়ে বসেছেন। আপনাকে আমি বিপুল পরিমানে কিছু অর্থ দিতে পারি যদি এর বিনিময়ে আপনি আমাকে সাহায্য করে থাকেন।'
'কেমন সাহায্য?'
'আশা করি প্রোপোজালটি আপনার পছন্দ হবে। আমি পত্রিকায় কিছু আর্টিকেল লেখব। ইতিমধ্যে আগ থেকে কিছু পরিকল্পনা মাথায় স্থির আছে। ভয়ের কিছু নেই, আপনি যদি রাজি হোন তবে এগোনো যাবে।'
নীলাকার ভাবল, এই মানুষটা হয়ত তার 'বৃত্তান্ত রোগ ব্যাধির' সম্পর্কে জেনে গেছে। বেকারত্ব জীবনের অসহায় মুহূর্ত কাটাবার জন্য রাজি হওয়াটা খারাপ হবে না। সময়টাও ভাল কাটবে।
নীলাকার বলল,'পরিকল্পনা মজার হলে রাজি হওয়া যাবে।'
কবির সংক্ষিপ্ত আকারে নীলাকারকে সব খুলে বলল। নীলাকার খুশি হয়ে রাজি হয়ে গেল। কবির লাফ দিয়ে উঠে বসে সবার প্রথমে সম্পাদককে সুসংবাদ জানিয়ে দিল। নীলাকারের কাছে ফিরে এসে কবির অভিনন্দন জানালো।
নীলাকার কবিরকে বাসায় নিয়ে এলো। আলাপ-আলোচনা করল। কবির নীলাকারের ব্যাপারে আরো জানার আকুতি প্রকাশ করল। নীলাকার সম্মত হলো।
নীলাকার বলতে শুরু করল,'গত মাসের কথা, যেই সময়টা তার বেশ ভাল চলছিল। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য ঘরে মানুষের ভিড় জমে উঠত। অনেকে শখ করে অনেক উপহার দিয়েছিল।একজন দিয়েছিল একটা দামি হাতের ঘড়ি। এই প্রাসঙ্গিকে একটা কথা বলি।
সেই সুসময়ে একটা খারাপ খবর এসেছিল। যেদিন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে অফিসে কাজের উদ্দেশ্য রওনা হবো সেদিন আমি ওই ঘড়িটি পড়েছিলাম। সেই দুর্ভাগ্যবশত 'গোলকার' মাথার ঘড়িটা দেখে আমি কাজের জন্য বের হচ্ছিলাম তখনই আসলো ফোন কল। আমার সহকর্মী তাহেরের কল ছিল। সে জানিয়ে দিল আজকে কাজে না গিয়ে রাতে তার বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করতে। খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম।
রাতে তাহের বাসায় ফেরার আগে উপস্থিত ছিলাম। সে এসে আমাকে অফিসের ইস্তফা ধরিয়ে দিল। খুব আকুতি গলায় বরখাস্ত থামানোর প্রচেষ্টার কথা বলে গেল।
আমি ততক্ষণাৎ ব্যাপার বুঝে উঠলাম। হাসপাতালের আমার অসহায়ের মুহুর্তে ম্যানেজার কিছু টাকাগুলো পাঠিয়েছিল।মূলকথা, টাকাগুলো আমারই ছিল। ইস্তফার আগে জমাকৃত টাকাগুলো শোধ করে হাসপাতালে পাঠিয়ে নিজেকে সহৃদয়তার পরিচয় দিচ্ছিলো। এটি ছিল নিতান্ত লোকদেখানো কর্ম। তখনই আমার ইস্তফা ম্যানেজার তৈরী করে ফেলেছিল। আমার বুঝে উঠার উচিত ছিল।
অন্যদিকে বাসায় এ খবর গোপন রাখতে চেয়েছিলাম। দরকার হয়নি, সেইরাতে আমি ঘটনা স্ত্রীকে জানিয়ে দিলাম। এরপর সকালে ব্যাগ গুছিয়ে না জানিয়ে, আমার ছেলেটাকে নিয়ে শ্বশুরের বাসার চলে গেল। টেবিলে একটা অভিমানের পত্র রেখে গিয়েছিল, সেটি পড়ে সব জানতে পারলাম।
নিজ ভাগ্যের উপর রেগে গিয়ে বাসায় যে ট্যাবলেট ছিল, সব ফেলে দিলাম। অনাকাঙ্ক্ষিত সকালের খবরে দেখলাম,যে ট্যাবলেটগুলো আমি ফেলে দিয়েছিলাম ওই ফার্মাসির দোকানকে মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষুধ বিক্রির অপরাধে জরিমানা করেছিল। এখানে মজার ব্যাপার কি জানেন?
আমি যে ঔষুধ নিতাম সেসব ট্যাবলেটই ছিল বৃত্তাকার।'
নীলাকার হেসে উঠল। কবির বৃত্তাকার ব্যাপারটি বুঝল না বিধায় সামান্য মুচকি দিয়ে বলল,'আমি জানতাম, আমি একজন ঠিক মানুষের সন্ধানে ছিলাম। এখন আমি পুরোপুরি নিশ্চিত।'
'কি নিয়ে?',নীলাকার জানতে চাইলো।
'আপনার কাছে যে অসাধারণ শক্তি আছে ওটা পরখ করতে পেরে।'
নীলাকার শক্তির ধারনা সম্পর্কে বুঝতে পারল না। নীলাকার অকেজো হলেও খাটি চালাক বটে। সে সেই মুহূর্তে বুঝতে পারল কবির নামের লোকটি তার 'বৃত্তাকার' আশংকা থেকে অজ্ঞাত ছিল।
নীলাকার সুযোগ নেওয়া শুরু করল। সে পাণ্ডিত্য বেশ্যা সেজে বলতে লাগল,' এরকম বহু প্রকারের সাহায্য আমি করে এসেছি। আমি তোমার সাহায্য করতে প্রস্তুত। এখন তোমার পরিকল্পনা আমাকে বিস্তারিত জানিয়ে দাও।'
কবির, তার সম্পূর্ণ পরিকল্পনা নীলাকারকে জানালো। নীলাকার কবিরের অভিপ্রায় শুনে উৎসুক।
পরিকল্পনা অনুযায়ী কবির বেশ্যা পরিবর্তন করে নীলাকারের সঙ্গে বাজার ঘুরবে। হাতে থাকবে হিডেন ক্যামরা। কবির সন্দেহজনক কয়েকটি দোকানে ঢুকবে এবং সন্দেহ সত্যতে পরিণত হলে পুলিশ দ্বারা তল্লাশি চালাবে। যাচাই করার দায়িত্ব নীলাকারকে দেওয়া হলো। কবির বিশ্বাস নীলাকারের সহনশীল শক্তি দ্বারা ভেজাল খাবার দ্রব্য যাচাই করা সম্ভব হবে।
নীলাকার জানে, তাকে কিছু করতে হবে না। সে গোলচাক্রিক কিছু দেখতে পেলে নিঃসন্দেহে কবিরকে জানাবে।
কবির প্রথমে নীলাকারকে নিয়ে গেল বেকারীর দোকানে। নীলাকার গোলাকার কিছু দেখেই কবিরকে ইঙ্গিত দিয়ে জানাতে থাকল। কবির সব ইনফরমেশন কলেক্ট করতে থাকলো। যেমন, নীলাকার ইঙ্গিত দিচ্ছিল কড়াইয়ের দিক আর কবির ভেবে বসেছিল 'তেল-ভেজাল' কিংবা নীলাকার যদি মিষ্টান্ন কিছু ইঙ্গিত করছে তবে কবির ভেবে বসেছিল 'দুধে ভেজাল'।
ফলের দোকানে গিয়ে একই কান্ড ঘটালো। এবড়োখেবড়ো আকারের ফলগুলো বাছাই না করে নীলাকার সরাসরি টাটকা গোলাকার ফলগুলো বাছাই করতে শুরু করল। ফলগুলো বাইরে থেকে দেখলে কেউই বলবে না এগুলো ভেজাল। অথচ নীলাকার কি ভেবে ইঙ্গিত করে যাচ্ছে কবিরের মাথায় কিছু পাকছে না। মাঝেমাঝে নীলাকারের উপর সন্দেহ তুলছিল।
কবির বাজারের পর্যবেক্ষণ শেষ করে নীলাকারকে বিদায় দিয়ে দিলো। সে রাতে ফোন করে তথ্য জানিয়ে দেবে বলে নীলাকারকে জানালো।
নীলাকার সারাটা দিন শুয়ে শুয়ে কাটিয়ে দিল। তার হাতে কিছু কাজ ছিল না। বাচ্চাটাকে একবার যে দেখে আসবে সে সাহস তার নেই। আশাহত মন নিয়ে নিদ্রায় যাপন করল ।
সন্ধ্যের পর একটা ফোনকল এসে নীলাকারের নিদ্রা কেড়ে নিল। অচেতন চোখে ফোন রিসিভ করতেই অবিশ্বাস কন্ঠ নিয়ে কবির নীলাকারকে ধন্যবাদ জানাতে থাকল। নীলাকারের কাছে এটা নতুন কিছু না। নীলাকারের কাছে দুর্ভাগ্যের অভাব ছিলনা। দুর্ভাগ্যকে সৌভাগ্যকে পরিণত করতে পেরে নীলাকার খানিকটা হলেও খুশি হয়েছিল। ইন্সপেক্টর তাকে আগামীকাল থানায় ডেকেছে। সে কি-না খুব খুশি হয়েছিল। তিনি নীলাকারের প্রশংসা গোটা শহর ছড়িয়ে দিলেন।
বহুদিন পর নীলাকার সিগারেট জ্বালালো। আজ রাতভর সে নেশায় মগ্ন থাকতে চাই। পাশে কবির বসে ছিল। তারা দুজন ছাদে বসেছিল। কিছুক্ষন সুখ-দুঃখের গল্প ভাগ করতে থাকলো।
নীলাকার জানালো এই রোগের ভয়ে চা'র কাপে বিস্কুট ডোবাতে ভয় পেত। প্রতিদিন ভয়ে ভয়ে জেগে থাকতে হতো। ভেবে নিয়েছিল যেকোন মুহূর্ত তার মৃত্যু পিস্তলের গুলিতে হবে। ট্রাফিক সিগনেল অমান্য করত না। ট্রাফিক সিগনেলের গোলাকার বক্স দেখে এমনি ভয় পেত। অফিসের কাজ ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে ঘাড়ে আলসেমির ভূত আকড়ে ধরল।
নীলাকারের নাম 'গোলাকার' হলে না-কি বেশ মানাতো। তার জীবনটাও এক বৃত্তাকারে চক্রান্ত। কখনো দুঃখ কিংবা কখনো সুখ। কবিরকে বুঝালো আজকে সামান্যটুকু কাজটি করে তার কতই যে তৃপ্তি লাগছিল।
কবির কিছু বলল না। নীলাকারের অনর্গল কথা নীরবে শুনে গেল।
নীলাকার সকালে থানায় হাজির হলো। ইন্সপেক্টর রফিক সাহেব তাকে খুব প্রশংসা করল। নাস্তা প্রদান করে সযত্নে খাতির করল। রফিক সাহেব তার পার্সোনাল ফোন নাম্বার নীলাকারকে দিয়ে জানালো যে প্রয়োজনে তাকে কল করে কিছু জানাতে। এরপর অদ্ভুত শক্তির ব্যাপারে জ্ঞাত হল।
ইন্সপেক্টর রফিক সাহেবের মাথায় একটা বুদ্ধি চলে আসল। নীলাকারের সাথে সে ব্যাপারে গোপনে আলাপ করল। জানালো এই ডিপার্টমেন্টে কদিন আগে অসাধু প্রক্রিয়ায় ঘুষ নেওয়ার পাক্কা ইনফরমেশন এসেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক অসৎ ইন্সপেক্টরের নামটা জানতে পারল না।
রফিক সাহেব জানালো যে ইন্টেলিজেন্স এজেন্টদের মাধ্যমে কাছে এই থানার প্রতি ডেস্কের অর্থের পরিমান হিসাব করা আছে। তাকে শুধু বের করতে হবে ব্যক্তিটি কে হতে পারে। সাধ্যের বাইরে বিধায় রফিক সাহেব নিজে বের করতে পারল না। সবাইকে তল্লাশি করার খবর মিডিয়ায় ছড়িয়ে যাওয়ার পর ডিপার্টমেন্টের বদনাম হবে ভেবে গোপনে এসব কাজ সারতে হচ্ছে।
নীলাকারের গলা শুকিয়ে পড়ল। কাজটা কীভাবে করবে কিছুভাবে বুঝতে পারল না। রফিক সাহেব তাকে এক সপ্তাহের সময় দিলেন। অনেক সৎ,কর্মঠ এবং হাসিখুশিতে থাকা ইন্সপেক্টরটাকে নীলাকারের মন চাইনি। তাকে নারাজ করার সুযোগ দিতে ইচ্ছে করল না। দু-তিনদিন মন দিয়ে অনেক চিন্তা করল। তবু ব্যর্থতার আসরে ঝুকতে হল।
পাচদিনের মাথায় নীলাকার থানায় হাজির হলো। ইন্সপেক্টর রফিক সাহেবকে ব্যক্তিটির ব্যাপারে ইনফর্ম করে দিল এবং শেষমেশ যাচাই করার পর অসাধু ব্যক্তিটি ধরা পড়ল। পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এবং আইটি অফিসাররা নীলাকারের বুদ্ধিমত্তায় প্রবলভাবে সন্তুষ্ট হল। অনেকে পরমায়ুর প্রার্থনা করে দিল। তাদের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দিল। নীলাকার বিনয়ের সঙ্গে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিল। কারন নীলাকার জানত তার মত অকেজো লোক দ্বারা ওসব কাজ সম্ভব হবে না।
নীলাকার উপহারের অর্থ পেয়ে বাসায় ফিরল। টেবিলে থাকা হিসাবের কাগজগুলো পুড়িয়ে ফেলল। নীলাকার মুচকি হেসে অর্থের পরিমানগুলো দেখতে থাকল। নীলাকার দু-চারজনের লিস্ট করেছিল এবং ওসব লিস্টে যাদের অর্থের ভাগে শূন্যের পরিমান বেশী ছিল নীলাকার কেবল তাদেরই দায় করেছিল। নীলাকার উন্মাদে সশব্দে হাসতে থাকল।
শহরে আতঙ্কের অন্য নাম ছিল বাবলু সদস্য। তাদের নেতার নাম বাবলু। নেতার নামেই জঙ্গী সংঘঠনটি করা হয়েছিল। রীতিমত কয়েকটি শহর কাপিয়ে ইতিমধ্যে লুকিয়ে থাকার জন্যে বাবলু নীলাকারের এলাকা বাছাই করল।
পুলিশফোর্স পুরোদমে বাবলুর খোজ চালাচ্ছে। কেবল বাবলু ছাড়া বাবলু সদস্যের প্রত্যেক অপরাধীরা ধরা পড়ল। তারা স্বীকার করে নিল বাবলুর ব্যাপারে। ইন্সপেক্টরদের একটি দুর্বলতা ছিল যে বাবলুর চেহারা এখনো চিহ্ন করতে পারেনি।
অন্যদিকে কখন এবং কিভাবে বাবলু এলাকার লোকদের সাথে খাপ খাইয়ে নিল কেউ টের পেল না। নীলাকারদের এলাকায় এমনভাবে প্রবেশ করল যেন এক পথিক মুসাফির। গন্তব্য যার শেষ হইনি। ক্লান্ত,অবসন্ন এবং নিপীড়িত একজন মানুষ যার কোন আশ্রয় নেই। কয়েকদিনের মেহমান হয়ে এসে ভদ্রাতার সংস্থাপনে সবার সাথে বেশ ভালভাবে খাপ খেয়ে নিল।
কাকতালীয়ভাবে, নীলাকার বাবলুর আচার-আচরণে অনেক সন্তুষ্ট হল এবং ধীরে ধীরে বন্ধুত্বে পরিণত হয়ে গেল।
পরিবেশের সাথে মিশে যাওয়াটা ছিল বাবলুর সম্পূর্ণ পরিকল্পিত নাটক। কারন তার দরকার ছিল কিছুটা সময়। সেই সময়ের ভেতর তৈরী করতে চেয়েছিল বোমা-বিস্ফরকের যন্ত্র এবং সুযোগ পেয়ে সে কিছুদিনের ভেতর যন্ত্রটি তৈরী করতে সক্ষম হল।
পরদিন ইন্সপেক্টরদের কাছে হুমকিটা পৌছানোর পর থানায় সবার বুকেই বোমা-বিস্ফোরিত হল। কম সময়ের ভেতর বিস্ফোরক থামানো সম্ভব বলে মনে হচ্ছিল না। অফিসাররা হার মানেনি।
দিনরাত এক করে বাবলু সদস্যদের কাছে থেকে বাবলুর চেহারার আভাস বের করতে সক্ষম হল। জনসমাগমের মাঝে খবর ছড়িয়ে উত্তেজিত করতে চাইল না। তাই কয়েকটি অফিসারকে প্রত্যেক পাড়ায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঠানো হলো।
অন্যদিকে, বাবলু এ ব্যাপারে জানার পর তাড়াহুড়ো করে শহর ছাড়ার জেদ দেখাল। নীলাকার ব্যাপারটা মানতে পারল না। তাকে অনেক করে বলল থাকার জন্য কিন্তু বাবলু মানল না। রাতে বন্ধুটিকে ট্রেনে উঠিয়ে দিতে স্টেশন পর্যন্ত চলে আসল।
বোমা ব্যাগটি বাবলু স্টেশনে নিয়ে আসল। বোমা স্টার্ট করলে ১২ ঘন্টা পর বিস্ফোরিত হবে। বাবলুর কাছে সময় ছিল না। তাকে আগে শহর ছাড়তে হবে।
বোমা ব্যাগের ব্যাপারে নীলাকার অজ্ঞাত ছিল। নীলাকার আর বাবলু ট্রেনের জন্য বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করতে থাকল।
নীলাকার চিন্তা করতে থাকল, 'হতে পারে এই বেঞ্চিতে বসে তার স্ত্রী-বাচ্চাটা ট্রেনের জন্য শহর ছাড়ার শেষ সময়ের অপেক্ষাটা করেছিল। বিরাট সময়ের অপেক্ষা। মাঝেমাঝে হয়ত ছেলেটার ঝিম ধরেছিল। পাশে তার বাবা ছিল না বলে মাকে কাছে পেয়ে কোলে মাথা রেখেছিল। বাবা হয়ে ছেলেটাকে কোন আদরই দিতে পারলাম না।'
নীলাকার নিজেকে বাবা হিসেবে অপরাধ মনে করতে থাকল। নীলাকার উঠে গিয়ে স্ত্রীকে একটা কল করল। রিং বাজল কিন্তু কেউ ধরল না। দু-তিনবার কল করল, ধরল না। নীলাকার আফসোস করে ভাবল যে স্ত্রীর অভিমান কি চিরতরে থেকে যাবে কি-না।
নীলাকার বেঞ্চে ফিরে এসে চোখের জল ফেলল। কাউকে প্রকাশ্য দেখাল না। বাবলু সিট থেকে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেল। ব্যাগটি সাথে নিয়ে গেল। কেবল ভুলক্রমে ব্যাগ থেকে রিমোট কন্ট্রোলটি পড়ে বেঞ্চে থেকে গেল।
নীলাকার স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে পাশে দেখল। বাবলু নেই। পাশে ছোট একটি রিমোট। রিমোটটার কেবল একটা বাটন আছে। বড় এবং গোলাকার।
নীলাকার থ হয়ে চেয়ে রইল। কি হতে পারে তার আন্দাজ ছিল না। বাবলুর ব্যাগ থেকে পড়ে গিয়েছিল সেটি নিশ্চিত ছিল। কারন এখানে বসার আগে বেঞ্চে তেমন কিছু ছিল না।
'গোলাকার' জিনিসকে অগ্রাহ্য করতে চাইনি। সে জানে গোলাকার মানে বিপদ। হতে পারে বাবলুর যেকোন বিপদ।
নীলাকার রিমোট নিয়ে দৌড়ে টেলিফোন বুথে চলে গেল। ইন্সপেক্টর রফিক সাহেবের নাম্বার তার জানা ছিল। কল করে সব জানানোর পর তিনি সব বুঝতে পারলেন। রফিক সাহেব নীলাকারকে সর্তক থাকার আহবান দিল এবং জানালো যে তারা শীঘ্রই সেখানে পৌঁছুবে।
নীলাকরের বিশাল নামটা কেটে অফিসের কর্মচারীরা তাকে 'নীল' বলে ডাকে। 'নীলু' কিংবা 'নীলা' ডাকার ফলে মহিলা নামের একটা সংকোচ ভাব থেকে যায়। ওটা এড়ানোর জন্যে সবাই তাকে 'নীল' বলে ডাকে।
নীলাকারের কাছে ম্যানেজার থেকে দু'একবার সাবধানবানী এসেছিল। তার বেতন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। যার নিষ্ঠুরতার ভোগ পোহাতে হচ্ছিল নীলাকরের সংসারে থাকা দশ বছরের সন্তান এবং স্ত্রীকে।
এরপর থেকে বাবু নীলাকর কাজে মনোযোগ দেওয়া শুরু করে। শুধুমাত্র তার পরিবারের কথা চিন্তা করে। কাজের চাপ বুঝতে পেরে ম্যানেজারের সাথে কথা বলে মাইনে বাড়ানোর নিস্ফল আবদন করে। ম্যানেজার তাকে অনেক আগে থেকে চেনে। তার কাজের ধীরতা আগ থেকে টের পেয়ে মাইনে বাড়ানোর চিন্তা ভুলে গিয়ে উল্টো নীলাকারকে নতুন চাকরী খোজার সুপারিশ করল।
এদিকে নীলাকর মর্মাহত হয়ে অফিসের খবর পরিবারকে জানলে, স্ত্রী রীতিমত রেগে গিয়ে জানিয়ে দেয় যে এক মাসের ভেতর যদি কোনরূপে মাইনে বাড়াতে না পারে তবে ঘর ছেড়ে দিয়ে পিত্রালয় যাত্রা করবে।
স্ত্রী রেগে যাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। ঘরে খাবার কেনা-ছেলেটার স্কুলের ফি দেওয়া-মাসে মাসে বিদ্যুৎ এর বিল,বালা কেনার খরচ ছাড়াও যাবতীয় বাদবাকি খরচ একজনের পক্ষে এতকিছু টানা সম্ভব নই যখন দেখা যায় ঘরের কর্তার মাইনে খুবই স্বল্প পরিমানের।
নীলাকর কিছু বুঝতে পারে না,কি করবে। রাতভর ঘরের বাইরে জেগে জেগে সিগারেট এর স্ফুলিঙ্গ উড়াতে থাকে। এরপর নীলাকর সব জায়গায় চাকরীর আবেদন করে দেখে। স্ত্রীর এক মাসের সময় খুব শীঘ্রই ফুরাতে শুরু করে।
একদিন গভীর রাতে বাসায় যাওয়ার পথে নীলাকরের সাথে এক যোগীর সাথে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। চাটাই পেতে এক বিশাল বটগাছের নিচে বসেছিল। আনমনে ধ্যান করে যাচ্ছিল। যোগীর পরনে ছিল লাল রঙের একটি লম্বা কাপড় যা পুরো শরীরজুড়ে পেচানো ছিল। মাথায় গুচ্ছভর্তি উস্ক-শুষ্ক চুল। মুখে রং মাখা এবং মাথায় ছিল বেশ বড় টিকা যার ফলে চেহারার আভাস বুঝা যাচ্ছিল না।
নীলাকর পাশে যেতেই হুট করেই যোগী তার রাঙা দুটি চোখ খুলে বসল। নিলাকর প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিল, স্বাভাবিক হয়ে ফিরে যোগীকে জিজ্ঞাসা করল সে এখানে কি করছে।
যোগী জবাব দিল না। নীলাকর এভাবে তার পরিচয় জানার চেষ্টা করল। যোগী তার কোন কথার উত্তর না দিয়ে বলল, '।
নীলাকর যোগীর চরনের বিন্দুমাত্র বুঝতে পারল না। বুঝার উচিতও ছিল না ভেবে আস্তে করে পাশ কেটে চলে যেতে লাগল। লোকটি যোগী বেশে পাগল হতে পারে, নীলাকর ভাবতে লাগল।
যোগী একই চরন সশব্দে আবার বলতে লাগল।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নীলাকর গতরাতের ঘটনাকে স্বপ্ন ভেবে তুমুলভাবে নিঃশব্দে হাসতে লাগল। ঘুমকাতুরে ছেলেটিকে দেখে থেমে গেল।
নীলাকর ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আফসোস করতে লাগল। অসহায় বাবা হয়ে ছেলেটির গায়ে হাত বুলিয়ে স্নেহ দান করে বলল,'আর কিছুটা সময় দে, তারপর তুই যা যা স্বপ্ন দেখছিস তা সবটা আমি পূরন করব'।
নীলাকর জীবন বদলানো না। কর্মচারীদের কথা শুনে পত্রিকায় চাকরী খোজ দেয়। রুটিন মাফিক প্রতিদিনের অফিসে বকাঝকা এবং কাজে কিছুটা ভুল হলে চাকরি ছাড়ার নির্দেশনা চলতে থাকে। এইগুলো নিয়ে তার দু-একদিন এভাবে কাটছিল, কিছুই বদলালো না। নীলাকারের জীবন নিরানন্দ থেকে গেল।
রাতে বটগাছের পথটা দিয়ে যাওয়ার সময় কাউকে দেখতো না। পথে যাওয়ার সময় অনেক উদ্ভট খেয়াল জেগে উঠত। মাঝেমাঝে ভাবত,যদি আবার কোন তপস্বী-ফকিরের দেখা পেলে বেশ ভাল হতো। সে রাতে নীলাকারের চলে যাওয়াটা ভুল মনে করল।
এক সকাল বেলা তাড়াহুড়ো করে বাস ধরে অফিসের দিকে রওনা হচ্ছিল। রাতে জেগে থাকার ফলে ঘুম থেকে দেরী উঠতে হলো। অফিসে কি প্রকারের ঝাড়ি খাবে সারাটাপথ চিন্তা করতে লাগল।
কিছুক্ষন পর নীলাকর খেয়াল করল, যে বাসে চড়ে যাত্রা করছিল সেই বাসটি হালকা দোলতে শুরু করছে। এটা স্বাভাবিক দোলানো ছিল না। বাসের কোনো যাত্রী খেয়াল করল না অথচ নীলাকর ব্যাপারটি বুঝতে পেরে বাসের জানালা দিয়ে সাবধানে মাথা বাইরে বের করে চাকার পর্যবেক্ষণ করে নিল।
নীলাকরের ধারনা সঠিক ছিল। এরপর ঘটনা সবাইকে জানানোর পর, ধাপে ধাপে কাজ করে একটা বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া গেল। গাড়ির চাকার স্ক্রু আলগা ছিল বলে এ সমস্যা হচ্ছিল। অবশেষে নীলকরকে সবাই ধন্যবাদ জানালো।
নীলাকর খুশি হয়ে খবরটা তার স্ত্রীকে জানালো এবং স্ত্রী খুশি হয়ে গোটা পাড়া ছড়িয়ে দিলো।
কাজের প্রেশার বেড়ে যাওয়ার কারনে নীলাকরের রাতে ঘুম ভাল হয় না। সারারাত জেগে ভাবে যে আগামী দিনটা কীভাবে শুরু করবে। চিন্তা করতে করতে সিগারেটের প্যাকেট শেষ করে দেয় তবুও চিন্তার শেষ নেই।
নেশা জিনিসটি বড়ই ক্ষতিকর। সিগারেট ছেড়ে দেওয়ার পণ নীলাকার অনেক আগেই করেছিল। ছাড়তে পারে নি। এদিকে অযথা টাকা খরচও চলছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিবারকে নিয়ে কখনো খুশি থাকা যাবে না।
অর্ধাঙ্গিনীর দেওয়া এক মাসের কিছুটা সময় এখনো বাকি আছে। মনে হচ্ছে শেষটুকু আর সম্ভব হবে না। ছোটকাল যদি পরিবারের শাসন শুনে ভাল করে পড়ালেখা করত তবে আজ এইদিন দেখতে হতো না।
শেষরাতে বিছানায় শুয়ে পাখার ঘুরন্ত দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে ঘুম আসল টের পেল না। ঘুম ভাল চলছিল। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে তীব্র যন্ত্রনা শুরু হলো। ব্যাথার ঘোর মাথা থেকে শুরু করে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। চোখ খুলা যাচ্ছিল না। পাশে শুয়ে থাকা স্ত্রীকে ডাকার চেষ্টা করে যাচ্ছিল কিন্তু মুখ থেকে শব্দ বের করতে পারল না। বহুক্ষণ পর চোখ খুলে চারদিকে মেলে তাকালো।
নীলাকারের সামনে একটা অপরিচিত মহিলা,চারপাশটা অপরিচিত জায়গা। নীলাকারের মাথায় ব্যান্ডেজ। কপাল ফুলা ছিল। শরীর নড়াতে পারছিল না। পাশে যে মহিলাটা ছিল সেটি ভৌ দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে কোথায় যেন চলে গেল।
নীলাকার কিছু বুঝে উঠার আগে দেখতে পেল দরজা খুলে স্টেথোস্কোপ পরা লোকের সঙ্গে মহিলাটার পুনরায় প্রবেশ। দরজার এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল তার স্ত্রী এবং সহকর্মী আবু তাহের।
নীলাকার,স্ত্রীকে দেখতে পেয়ে কিছুটা স্বস্তির শ্বাস ফেলল। স্ত্রীর কাছ থেকে পরে সব জানতে পারল। অপরিচিতা মহিলাটা নার্স ছিল এবং লোকটি ছিল ডাক্তার। গতরাত না-কি নীলাকারের মাথার উপর পাখা পড়ে গিয়েছিল। গভীর রাতে রক্তাক্ত শরীরটা ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসতে তাহের সাহায্য করেছিল। তাহেরের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা দরকার। তাহের জানালো, অফিস থেকে খবরটা জানার পর ম্যানেজার না-কি মন থেকে কিছুটা আহত হলো এবং কি যেন ভেবে তাকে কিছুদিনের ছুটির সাথে কিছু টাকাও পাঠিয়ে দিল। ম্যানেজার এমন কিছু করে বসবে নীলাকারের অজানা ছিল।
নীলাকার হতভম্ব হয়ে পড়ল। বৃত্তকারের রচনা এভাবে ভারী হয়ে পড়বে জানত না। নীলাকার তার স্ত্রীকে কাছে ডেকে নিজ ছেলেটাকে খুজতে লাগল। স্ত্রী আশ্বাস দিল পাশের বাড়ির বুয়াকে নিয়ে বাসায় নিরাপদে আছে।
বর্ষার সময়। সকাল থেকে গুড়ো গুড়ো বৃষ্টি পড়ছিল। নীলাকারের শরীর অবস্থা ততক্ষনে ভাল। কেবল হাতে নড়াতে কষ্ট হচ্ছিল। স্ত্রীকে না জানিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় হাটতে শুরু করল। আজকে ভিজতে মন চাইছে । শরীরে বৃষ্টির ফোটা পড়তেই শিহরণ অনুভূত করতে লাগল।
হেটে হেটে নীলাকার বটগাছের নিচে দাঁড়ালো। গাছটির অপর পাশে ছিল খেলার মাঠ। ছোট ছোট বাচ্চাগুলো কাদাতে ফুটবল খেলাতে মেতে উঠছিল।
নীলাকার সেই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে একবার যোগীর সাথে দেখা করেছিল। নীলাকার ওই রাতের কথাগুলো পুনরায় ভাবতে লাগল। ওই চরনগুলো আবার ভাবতে থাকল। চিন্তার মাঝে আনন্দ পেতে লাগল।
নীলাকার হঠাৎ রুখে গেল। চিন্তা ধারাকে একটু পিছিয়ে নিতে সে অবাকভাবে যোগীর চরন স্মরন করার চেষ্টা করতে থাকল। মাথায় চিন্তা আসার পর হৃদস্পদন ধুক কেপে উঠল।
'যোগীর কথা কি আসলেই সত্যি ছিল?', নীলাকার ভাবতে লাগল। 'এই গত কয়েদিন যাবৎ যে দুর্ঘটনা পেরিয়ে এসেছি তার মূলেই রয়েছে 'বৃত্ত'! বাসের চাকা এবং পাখার মাথাটিও ছিল 'বৃত্তকার'।
নীলাকারের যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। সে ভয় পেতে লাগল এবং আশেপাশে বৃত্তের খোজ করতে লাগল। যেকোন মুহূর্তে এবং যেকোন প্রকারের গোলাকার জিনিস তাকে এড়াতে হবে।
নীলাকার থ হয়ে বাচ্চাদের ফুটবলের উপর লক্ষ করল। 'এই ফুটবলটিও গোলাকার। তবে এটার সাথে বিপদের কি সংযোগ হতে পারে?', নীলাকার বলল। নীলাকার নিজের ভুল-ভ্রম ভেবে মুচকি দিল।
এমন সময় ফুটবলটি মাঠের পূর্ব দিকের খাদে পড়ল। বৃষ্টির পানিতে ভরে যাওয়ার কারনে বলটি সেখানে পড়ে ভাসতে থাকল। নীলাকার স্পষ্টভাবে লক্ষ করল বৈদ্যুতিক পাইপ থেকে একটি তার ছিটকে এসে সেখানে ডুবে ছিল। নীলাকার বুঝতে পারল তারটি যদি সচল থাকে তবে যেকোন মুহূর্তে অমঙ্গলজনক কিছু ঘটে যেতে পারে।
নীলাকার ভাবল আগে থেকে ছেলেদের সাবধান করে দেওয়া উচিত। যেই চিন্তা সেই কাজ।
প্রথমে নীলাকারের কথা কেউ বিশ্বাস করছিল। এরপর পাড়ার জ্ঞাত বড়জন কাউকে বলার পর ব্যাপারটা নিরিখ করে বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারল।
সকলে নীলাকারকে প্রশংসা করল। নীলাকারের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ব্যাপারটা এতোই সাংঘাতিক ছিল বটে যার জন্যে খবরটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এলাকার বিভিন্ন পদের বড় সর্দাররা নীলাকারের বাসায় এসে তাকে একবার করে দেখে গেল।
কবির হাতে পেপার নিয়ে বসল। নীলাকারের গুঞ্জন অনেকদিন যাবৎ কানে আসার পর সে নড়েচড়ে বসল। ব্যাটা অনেকদিন ধরে এসব খবরের অভাবে গলা শুকিয়ে খা খা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কবির পেশায় জার্নালিস্ট। রোমাঞ্চকর খবরের জন্য কখনো এ অঞ্চলে বা কখনো ওই অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়। পত্রিকায় বিভিন্ন আর্টিকেল লিখে দিন রোজগার হয়। কবির, গুজব খবর ছাপিয়ে মন থেকে কখনো খুশি হতে পারত না। মিথ্যে খবর ছাপাতে ছাপাতে হৃদয়ের ফাঁকফোকর গুলোতে মরিচিকা ধরতে শুরু করল। নীলাকারের বিষয়টা অগ্রাহ্য করা যায় না।
এক বিকেলে কবির নীলাকারের সাথে সাক্ষাৎ করতে যায়। সেই শেষ ঘটনার আজ ফুমাস পার হলো। অনেকদিন পর নীলাকারের সাথে কেউ সাক্ষাৎ করতে এলো।
নীলাকারকে বাসায় পাওয়া গেল না। তাকে খুজতে খুজতে কবির খেয়াঘাটে চলে আসল। নীলাকার আপন বিলাসে চোখবুজে পাড়ে শুয়ে ছিল।
কবির নীলাকারকে চেনার পরও না চেনার ভান ধরে বলল,'আপনি কি সমিত্র নীলাকার সাহেব? '
নীলাকার সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে ফেলল। মনে হচ্ছিল ঘুমটা সবেমাত্র এসেছিল। বিরক্তির আভাস দেখিয়ে বলল,'আপনি কে, কেন খুজছেন আমাকে?'
'তাহলে আপনিই নীলাকার সাহেব।'
'হ্যা,আমি নীলাকার। কি কাজ?'
'আমি শুধু আপনাকে দেখার খাতিরে আসিনি। আপনার সাথে দু-একটা কথা বলেই চলে যাবো। যদি আপনি বিরক্তবোধ না করেন।'
'কি বলবেন বলেন।'
কবির নীলাকারের পাশে বসেত বসতে বলল,'আশা করি, আমার কথাগুলো শুনে আপনার ভাল লাগবে। আপনি সেদিন বাচ্চাগুলোকে বাচিয়ে অনেক বড় উপকার করেছিলেন।'
'এটা নতুন কথা কিসের। এবারের মত ষাটবারের মত একথা শুনে আসছি। নতুন কিছু বলার থাকলে বলেন।'
কবির সামান্য হেসে আবার বলতে লাগল,'মানুষ হিসেবে আপনি মহৎ কাজ করে গেলেন। তবে একটা কথা বলব। এলাকার মানুষ যেটা খেয়াল করেনি সেটা আমি লক্ষ করেছি।'
'যেমন?'
'যেমন, সেই ঘটনার আগেও না-কি আপনার সাথে এমন উদ্ভট সব কান্ড ঘটত। আপনি অন্যদের সাহায্য করতে যেতেন বটে কিন্তু স্বয়ং নিজ জীবনে আনন্দের মুহূর্তগুলো থেকে বিতাড়িত থাকতেন।'
নীলাকার রহস্যময় চোখে একবার চেয়ে নিল। তারপর বলল,'আপনি কে? আমার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আপনার এতো ধারনা কেমনে এলো?'
কবির এবার হেসে ফেললো। কবির উৎসুকভাবে বলল,'আমি একজন জার্নালিস্ট। খবর পাতায় লেখালেখি করি। মানুষের জীবন আমরা সহজে তুলে ধরতে পারি। আমাকে ভুল ভাববেন না। আমি আপনার জর্জরিত জীবনের উপর তামাশা করতে আসিনি। বরং সুসংবাদ নিয়ে এসেছি।'
নীলাকার বলল,'কেমন সুসংবাদ?'
কবির বলল,'আমি জানি, আপনি চাকরি হারিয়ে বসেছেন। আপনাকে আমি বিপুল পরিমানে কিছু অর্থ দিতে পারি যদি এর বিনিময়ে আপনি আমাকে সাহায্য করে থাকেন।'
'কেমন সাহায্য?'
'আশা করি প্রোপোজালটি আপনার পছন্দ হবে। আমি পত্রিকায় কিছু আর্টিকেল লেখব। ইতিমধ্যে আগ থেকে কিছু পরিকল্পনা মাথায় স্থির আছে। ভয়ের কিছু নেই, আপনি যদি রাজি হোন তবে এগোনো যাবে।'
নীলাকার ভাবল, এই মানুষটা হয়ত তার 'বৃত্তান্ত রোগ ব্যাধির' সম্পর্কে জেনে গেছে। বেকারত্ব জীবনের অসহায় মুহূর্ত কাটাবার জন্য রাজি হওয়াটা খারাপ হবে না। সময়টাও ভাল কাটবে।
নীলাকার বলল,'পরিকল্পনা মজার হলে রাজি হওয়া যাবে।'
কবির সংক্ষিপ্ত আকারে নীলাকারকে সব খুলে বলল। নীলাকার খুশি হয়ে রাজি হয়ে গেল। কবির লাফ দিয়ে উঠে বসে সবার প্রথমে সম্পাদককে সুসংবাদ জানিয়ে দিল। নীলাকারের কাছে ফিরে এসে কবির অভিনন্দন জানালো।
নীলাকার কবিরকে বাসায় নিয়ে এলো। আলাপ-আলোচনা করল। কবির নীলাকারের ব্যাপারে আরো জানার আকুতি প্রকাশ করল। নীলাকার সম্মত হলো।
নীলাকার বলতে শুরু করল,'গত মাসের কথা, যেই সময়টা তার বেশ ভাল চলছিল। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য ঘরে মানুষের ভিড় জমে উঠত। অনেকে শখ করে অনেক উপহার দিয়েছিল।একজন দিয়েছিল একটা দামি হাতের ঘড়ি। এই প্রাসঙ্গিকে একটা কথা বলি।
সেই সুসময়ে একটা খারাপ খবর এসেছিল। যেদিন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে অফিসে কাজের উদ্দেশ্য রওনা হবো সেদিন আমি ওই ঘড়িটি পড়েছিলাম। সেই দুর্ভাগ্যবশত 'গোলকার' মাথার ঘড়িটা দেখে আমি কাজের জন্য বের হচ্ছিলাম তখনই আসলো ফোন কল। আমার সহকর্মী তাহেরের কল ছিল। সে জানিয়ে দিল আজকে কাজে না গিয়ে রাতে তার বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করতে। খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম।
রাতে তাহের বাসায় ফেরার আগে উপস্থিত ছিলাম। সে এসে আমাকে অফিসের ইস্তফা ধরিয়ে দিল। খুব আকুতি গলায় বরখাস্ত থামানোর প্রচেষ্টার কথা বলে গেল।
আমি ততক্ষণাৎ ব্যাপার বুঝে উঠলাম। হাসপাতালের আমার অসহায়ের মুহুর্তে ম্যানেজার কিছু টাকাগুলো পাঠিয়েছিল।মূলকথা, টাকাগুলো আমারই ছিল। ইস্তফার আগে জমাকৃত টাকাগুলো শোধ করে হাসপাতালে পাঠিয়ে নিজেকে সহৃদয়তার পরিচয় দিচ্ছিলো। এটি ছিল নিতান্ত লোকদেখানো কর্ম। তখনই আমার ইস্তফা ম্যানেজার তৈরী করে ফেলেছিল। আমার বুঝে উঠার উচিত ছিল।
অন্যদিকে বাসায় এ খবর গোপন রাখতে চেয়েছিলাম। দরকার হয়নি, সেইরাতে আমি ঘটনা স্ত্রীকে জানিয়ে দিলাম। এরপর সকালে ব্যাগ গুছিয়ে না জানিয়ে, আমার ছেলেটাকে নিয়ে শ্বশুরের বাসার চলে গেল। টেবিলে একটা অভিমানের পত্র রেখে গিয়েছিল, সেটি পড়ে সব জানতে পারলাম।
নিজ ভাগ্যের উপর রেগে গিয়ে বাসায় যে ট্যাবলেট ছিল, সব ফেলে দিলাম। অনাকাঙ্ক্ষিত সকালের খবরে দেখলাম,যে ট্যাবলেটগুলো আমি ফেলে দিয়েছিলাম ওই ফার্মাসির দোকানকে মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষুধ বিক্রির অপরাধে জরিমানা করেছিল। এখানে মজার ব্যাপার কি জানেন?
আমি যে ঔষুধ নিতাম সেসব ট্যাবলেটই ছিল বৃত্তাকার।'
নীলাকার হেসে উঠল। কবির বৃত্তাকার ব্যাপারটি বুঝল না বিধায় সামান্য মুচকি দিয়ে বলল,'আমি জানতাম, আমি একজন ঠিক মানুষের সন্ধানে ছিলাম। এখন আমি পুরোপুরি নিশ্চিত।'
'কি নিয়ে?',নীলাকার জানতে চাইলো।
'আপনার কাছে যে অসাধারণ শক্তি আছে ওটা পরখ করতে পেরে।'
নীলাকার শক্তির ধারনা সম্পর্কে বুঝতে পারল না। নীলাকার অকেজো হলেও খাটি চালাক বটে। সে সেই মুহূর্তে বুঝতে পারল কবির নামের লোকটি তার 'বৃত্তাকার' আশংকা থেকে অজ্ঞাত ছিল।
নীলাকার সুযোগ নেওয়া শুরু করল। সে পাণ্ডিত্য বেশ্যা সেজে বলতে লাগল,' এরকম বহু প্রকারের সাহায্য আমি করে এসেছি। আমি তোমার সাহায্য করতে প্রস্তুত। এখন তোমার পরিকল্পনা আমাকে বিস্তারিত জানিয়ে দাও।'
কবির, তার সম্পূর্ণ পরিকল্পনা নীলাকারকে জানালো। নীলাকার কবিরের অভিপ্রায় শুনে উৎসুক।
পরিকল্পনা অনুযায়ী কবির বেশ্যা পরিবর্তন করে নীলাকারের সঙ্গে বাজার ঘুরবে। হাতে থাকবে হিডেন ক্যামরা। কবির সন্দেহজনক কয়েকটি দোকানে ঢুকবে এবং সন্দেহ সত্যতে পরিণত হলে পুলিশ দ্বারা তল্লাশি চালাবে। যাচাই করার দায়িত্ব নীলাকারকে দেওয়া হলো। কবির বিশ্বাস নীলাকারের সহনশীল শক্তি দ্বারা ভেজাল খাবার দ্রব্য যাচাই করা সম্ভব হবে।
নীলাকার জানে, তাকে কিছু করতে হবে না। সে গোলচাক্রিক কিছু দেখতে পেলে নিঃসন্দেহে কবিরকে জানাবে।
কবির প্রথমে নীলাকারকে নিয়ে গেল বেকারীর দোকানে। নীলাকার গোলাকার কিছু দেখেই কবিরকে ইঙ্গিত দিয়ে জানাতে থাকল। কবির সব ইনফরমেশন কলেক্ট করতে থাকলো। যেমন, নীলাকার ইঙ্গিত দিচ্ছিল কড়াইয়ের দিক আর কবির ভেবে বসেছিল 'তেল-ভেজাল' কিংবা নীলাকার যদি মিষ্টান্ন কিছু ইঙ্গিত করছে তবে কবির ভেবে বসেছিল 'দুধে ভেজাল'।
ফলের দোকানে গিয়ে একই কান্ড ঘটালো। এবড়োখেবড়ো আকারের ফলগুলো বাছাই না করে নীলাকার সরাসরি টাটকা গোলাকার ফলগুলো বাছাই করতে শুরু করল। ফলগুলো বাইরে থেকে দেখলে কেউই বলবে না এগুলো ভেজাল। অথচ নীলাকার কি ভেবে ইঙ্গিত করে যাচ্ছে কবিরের মাথায় কিছু পাকছে না। মাঝেমাঝে নীলাকারের উপর সন্দেহ তুলছিল।
কবির বাজারের পর্যবেক্ষণ শেষ করে নীলাকারকে বিদায় দিয়ে দিলো। সে রাতে ফোন করে তথ্য জানিয়ে দেবে বলে নীলাকারকে জানালো।
নীলাকার সারাটা দিন শুয়ে শুয়ে কাটিয়ে দিল। তার হাতে কিছু কাজ ছিল না। বাচ্চাটাকে একবার যে দেখে আসবে সে সাহস তার নেই। আশাহত মন নিয়ে নিদ্রায় যাপন করল ।
সন্ধ্যের পর একটা ফোনকল এসে নীলাকারের নিদ্রা কেড়ে নিল। অচেতন চোখে ফোন রিসিভ করতেই অবিশ্বাস কন্ঠ নিয়ে কবির নীলাকারকে ধন্যবাদ জানাতে থাকল। নীলাকারের কাছে এটা নতুন কিছু না। নীলাকারের কাছে দুর্ভাগ্যের অভাব ছিলনা। দুর্ভাগ্যকে সৌভাগ্যকে পরিণত করতে পেরে নীলাকার খানিকটা হলেও খুশি হয়েছিল। ইন্সপেক্টর তাকে আগামীকাল থানায় ডেকেছে। সে কি-না খুব খুশি হয়েছিল। তিনি নীলাকারের প্রশংসা গোটা শহর ছড়িয়ে দিলেন।
বহুদিন পর নীলাকার সিগারেট জ্বালালো। আজ রাতভর সে নেশায় মগ্ন থাকতে চাই। পাশে কবির বসে ছিল। তারা দুজন ছাদে বসেছিল। কিছুক্ষন সুখ-দুঃখের গল্প ভাগ করতে থাকলো।
নীলাকার জানালো এই রোগের ভয়ে চা'র কাপে বিস্কুট ডোবাতে ভয় পেত। প্রতিদিন ভয়ে ভয়ে জেগে থাকতে হতো। ভেবে নিয়েছিল যেকোন মুহূর্ত তার মৃত্যু পিস্তলের গুলিতে হবে। ট্রাফিক সিগনেল অমান্য করত না। ট্রাফিক সিগনেলের গোলাকার বক্স দেখে এমনি ভয় পেত। অফিসের কাজ ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে ঘাড়ে আলসেমির ভূত আকড়ে ধরল।
নীলাকারের নাম 'গোলাকার' হলে না-কি বেশ মানাতো। তার জীবনটাও এক বৃত্তাকারে চক্রান্ত। কখনো দুঃখ কিংবা কখনো সুখ। কবিরকে বুঝালো আজকে সামান্যটুকু কাজটি করে তার কতই যে তৃপ্তি লাগছিল।
কবির কিছু বলল না। নীলাকারের অনর্গল কথা নীরবে শুনে গেল।
নীলাকার সকালে থানায় হাজির হলো। ইন্সপেক্টর রফিক সাহেব তাকে খুব প্রশংসা করল। নাস্তা প্রদান করে সযত্নে খাতির করল। রফিক সাহেব তার পার্সোনাল ফোন নাম্বার নীলাকারকে দিয়ে জানালো যে প্রয়োজনে তাকে কল করে কিছু জানাতে। এরপর অদ্ভুত শক্তির ব্যাপারে জ্ঞাত হল।
ইন্সপেক্টর রফিক সাহেবের মাথায় একটা বুদ্ধি চলে আসল। নীলাকারের সাথে সে ব্যাপারে গোপনে আলাপ করল। জানালো এই ডিপার্টমেন্টে কদিন আগে অসাধু প্রক্রিয়ায় ঘুষ নেওয়ার পাক্কা ইনফরমেশন এসেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক অসৎ ইন্সপেক্টরের নামটা জানতে পারল না।
রফিক সাহেব জানালো যে ইন্টেলিজেন্স এজেন্টদের মাধ্যমে কাছে এই থানার প্রতি ডেস্কের অর্থের পরিমান হিসাব করা আছে। তাকে শুধু বের করতে হবে ব্যক্তিটি কে হতে পারে। সাধ্যের বাইরে বিধায় রফিক সাহেব নিজে বের করতে পারল না। সবাইকে তল্লাশি করার খবর মিডিয়ায় ছড়িয়ে যাওয়ার পর ডিপার্টমেন্টের বদনাম হবে ভেবে গোপনে এসব কাজ সারতে হচ্ছে।
নীলাকারের গলা শুকিয়ে পড়ল। কাজটা কীভাবে করবে কিছুভাবে বুঝতে পারল না। রফিক সাহেব তাকে এক সপ্তাহের সময় দিলেন। অনেক সৎ,কর্মঠ এবং হাসিখুশিতে থাকা ইন্সপেক্টরটাকে নীলাকারের মন চাইনি। তাকে নারাজ করার সুযোগ দিতে ইচ্ছে করল না। দু-তিনদিন মন দিয়ে অনেক চিন্তা করল। তবু ব্যর্থতার আসরে ঝুকতে হল।
পাচদিনের মাথায় নীলাকার থানায় হাজির হলো। ইন্সপেক্টর রফিক সাহেবকে ব্যক্তিটির ব্যাপারে ইনফর্ম করে দিল এবং শেষমেশ যাচাই করার পর অসাধু ব্যক্তিটি ধরা পড়ল। পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এবং আইটি অফিসাররা নীলাকারের বুদ্ধিমত্তায় প্রবলভাবে সন্তুষ্ট হল। অনেকে পরমায়ুর প্রার্থনা করে দিল। তাদের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দিল। নীলাকার বিনয়ের সঙ্গে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিল। কারন নীলাকার জানত তার মত অকেজো লোক দ্বারা ওসব কাজ সম্ভব হবে না।
নীলাকার উপহারের অর্থ পেয়ে বাসায় ফিরল। টেবিলে থাকা হিসাবের কাগজগুলো পুড়িয়ে ফেলল। নীলাকার মুচকি হেসে অর্থের পরিমানগুলো দেখতে থাকল। নীলাকার দু-চারজনের লিস্ট করেছিল এবং ওসব লিস্টে যাদের অর্থের ভাগে শূন্যের পরিমান বেশী ছিল নীলাকার কেবল তাদেরই দায় করেছিল। নীলাকার উন্মাদে সশব্দে হাসতে থাকল।
শহরে আতঙ্কের অন্য নাম ছিল বাবলু সদস্য। তাদের নেতার নাম বাবলু। নেতার নামেই জঙ্গী সংঘঠনটি করা হয়েছিল। রীতিমত কয়েকটি শহর কাপিয়ে ইতিমধ্যে লুকিয়ে থাকার জন্যে বাবলু নীলাকারের এলাকা বাছাই করল।
পুলিশফোর্স পুরোদমে বাবলুর খোজ চালাচ্ছে। কেবল বাবলু ছাড়া বাবলু সদস্যের প্রত্যেক অপরাধীরা ধরা পড়ল। তারা স্বীকার করে নিল বাবলুর ব্যাপারে। ইন্সপেক্টরদের একটি দুর্বলতা ছিল যে বাবলুর চেহারা এখনো চিহ্ন করতে পারেনি।
অন্যদিকে কখন এবং কিভাবে বাবলু এলাকার লোকদের সাথে খাপ খাইয়ে নিল কেউ টের পেল না। নীলাকারদের এলাকায় এমনভাবে প্রবেশ করল যেন এক পথিক মুসাফির। গন্তব্য যার শেষ হইনি। ক্লান্ত,অবসন্ন এবং নিপীড়িত একজন মানুষ যার কোন আশ্রয় নেই। কয়েকদিনের মেহমান হয়ে এসে ভদ্রাতার সংস্থাপনে সবার সাথে বেশ ভালভাবে খাপ খেয়ে নিল।
কাকতালীয়ভাবে, নীলাকার বাবলুর আচার-আচরণে অনেক সন্তুষ্ট হল এবং ধীরে ধীরে বন্ধুত্বে পরিণত হয়ে গেল।
পরিবেশের সাথে মিশে যাওয়াটা ছিল বাবলুর সম্পূর্ণ পরিকল্পিত নাটক। কারন তার দরকার ছিল কিছুটা সময়। সেই সময়ের ভেতর তৈরী করতে চেয়েছিল বোমা-বিস্ফরকের যন্ত্র এবং সুযোগ পেয়ে সে কিছুদিনের ভেতর যন্ত্রটি তৈরী করতে সক্ষম হল।
পরদিন ইন্সপেক্টরদের কাছে হুমকিটা পৌছানোর পর থানায় সবার বুকেই বোমা-বিস্ফোরিত হল। কম সময়ের ভেতর বিস্ফোরক থামানো সম্ভব বলে মনে হচ্ছিল না। অফিসাররা হার মানেনি।
দিনরাত এক করে বাবলু সদস্যদের কাছে থেকে বাবলুর চেহারার আভাস বের করতে সক্ষম হল। জনসমাগমের মাঝে খবর ছড়িয়ে উত্তেজিত করতে চাইল না। তাই কয়েকটি অফিসারকে প্রত্যেক পাড়ায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঠানো হলো।
অন্যদিকে, বাবলু এ ব্যাপারে জানার পর তাড়াহুড়ো করে শহর ছাড়ার জেদ দেখাল। নীলাকার ব্যাপারটা মানতে পারল না। তাকে অনেক করে বলল থাকার জন্য কিন্তু বাবলু মানল না। রাতে বন্ধুটিকে ট্রেনে উঠিয়ে দিতে স্টেশন পর্যন্ত চলে আসল।
বোমা ব্যাগটি বাবলু স্টেশনে নিয়ে আসল। বোমা স্টার্ট করলে ১২ ঘন্টা পর বিস্ফোরিত হবে। বাবলুর কাছে সময় ছিল না। তাকে আগে শহর ছাড়তে হবে।
বোমা ব্যাগের ব্যাপারে নীলাকার অজ্ঞাত ছিল। নীলাকার আর বাবলু ট্রেনের জন্য বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করতে থাকল।
নীলাকার চিন্তা করতে থাকল, 'হতে পারে এই বেঞ্চিতে বসে তার স্ত্রী-বাচ্চাটা ট্রেনের জন্য শহর ছাড়ার শেষ সময়ের অপেক্ষাটা করেছিল। বিরাট সময়ের অপেক্ষা। মাঝেমাঝে হয়ত ছেলেটার ঝিম ধরেছিল। পাশে তার বাবা ছিল না বলে মাকে কাছে পেয়ে কোলে মাথা রেখেছিল। বাবা হয়ে ছেলেটাকে কোন আদরই দিতে পারলাম না।'
নীলাকার নিজেকে বাবা হিসেবে অপরাধ মনে করতে থাকল। নীলাকার উঠে গিয়ে স্ত্রীকে একটা কল করল। রিং বাজল কিন্তু কেউ ধরল না। দু-তিনবার কল করল, ধরল না। নীলাকার আফসোস করে ভাবল যে স্ত্রীর অভিমান কি চিরতরে থেকে যাবে কি-না।
নীলাকার বেঞ্চে ফিরে এসে চোখের জল ফেলল। কাউকে প্রকাশ্য দেখাল না। বাবলু সিট থেকে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেল। ব্যাগটি সাথে নিয়ে গেল। কেবল ভুলক্রমে ব্যাগ থেকে রিমোট কন্ট্রোলটি পড়ে বেঞ্চে থেকে গেল।
নীলাকার স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে পাশে দেখল। বাবলু নেই। পাশে ছোট একটি রিমোট। রিমোটটার কেবল একটা বাটন আছে। বড় এবং গোলাকার।
নীলাকার থ হয়ে চেয়ে রইল। কি হতে পারে তার আন্দাজ ছিল না। বাবলুর ব্যাগ থেকে পড়ে গিয়েছিল সেটি নিশ্চিত ছিল। কারন এখানে বসার আগে বেঞ্চে তেমন কিছু ছিল না।
'গোলাকার' জিনিসকে অগ্রাহ্য করতে চাইনি। সে জানে গোলাকার মানে বিপদ। হতে পারে বাবলুর যেকোন বিপদ।
নীলাকার রিমোট নিয়ে দৌড়ে টেলিফোন বুথে চলে গেল। ইন্সপেক্টর রফিক সাহেবের নাম্বার তার জানা ছিল। কল করে সব জানানোর পর তিনি সব বুঝতে পারলেন। রফিক সাহেব নীলাকারকে সর্তক থাকার আহবান দিল এবং জানালো যে তারা শীঘ্রই সেখানে পৌঁছুবে।
মিনিটখানেক পর পুলিশফোর্স স্টেশনে পৌছে সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে বাবলুকে গ্রেফতার করতে পারল। বাবলু একজন বড় অপরাধী হয়ে বের হবে সেটা নীলাকারের বিশ্বাস হচ্ছিল না।
সারা এলাকা,সারা শহর এবং সারা দেশজুড়ে নীলাকারের প্রতিভার সমাচার ছড়িয়ে পড়ল। খবরের কাগজে-টেলিভিশনের পর্দায় নীলাকারের সাহসিকতার গল্প শোনানো হচ্ছে।
সরকার অতিসন্তুষ্টি এবং গর্বের সাথে নীলাকারকে ম্যাডেল এবং কোটি টাকার চেক হাতে প্রদান করল। সাথে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দিল। নীলাকারের জীবন এভাবে পাল্টাবে সে নিজেই ভাবতে পারেনি। ঘরবাড়ি ও চাকরির সঙ্গে পরিবারকেও ফিরে পেল।
একদিন নীলাকার টিভি প্রোগ্রামের ইন্টার্ভিউ দিতে গিয়ে একটি তুমুল বিষয়ে বিচার করে বলল, ' দেখুন আমাদের দেশকে, দেশের পতাকাকে দেখুন তাহলে বুঝবেন কতটা হুমকির পথে আছে আমাদের এই বাংলাদেশ।
আমরা যদি নিয়ম-কানুন অমান্য করি, দেশের প্রয়োজনে এড়িয়ে চলি এবং দেশটিকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করে বেড়ায় তবে এই অপরূপ দেশটিকে স্বাধীন করা বুদ্ধিজীবী এবং মুক্তিযোদ্ধারদের ব্যর্থ মনে করব। আসুন, বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এবং উগ্রবাদী সমালোচনা বহিষ্কার করে দেশের কল্যানে এগিয়ে চলি।'
সারা এলাকা,সারা শহর এবং সারা দেশজুড়ে নীলাকারের প্রতিভার সমাচার ছড়িয়ে পড়ল। খবরের কাগজে-টেলিভিশনের পর্দায় নীলাকারের সাহসিকতার গল্প শোনানো হচ্ছে।
সরকার অতিসন্তুষ্টি এবং গর্বের সাথে নীলাকারকে ম্যাডেল এবং কোটি টাকার চেক হাতে প্রদান করল। সাথে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দিল। নীলাকারের জীবন এভাবে পাল্টাবে সে নিজেই ভাবতে পারেনি। ঘরবাড়ি ও চাকরির সঙ্গে পরিবারকেও ফিরে পেল।
একদিন নীলাকার টিভি প্রোগ্রামের ইন্টার্ভিউ দিতে গিয়ে একটি তুমুল বিষয়ে বিচার করে বলল, ' দেখুন আমাদের দেশকে, দেশের পতাকাকে দেখুন তাহলে বুঝবেন কতটা হুমকির পথে আছে আমাদের এই বাংলাদেশ।
আমরা যদি নিয়ম-কানুন অমান্য করি, দেশের প্রয়োজনে এড়িয়ে চলি এবং দেশটিকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করে বেড়ায় তবে এই অপরূপ দেশটিকে স্বাধীন করা বুদ্ধিজীবী এবং মুক্তিযোদ্ধারদের ব্যর্থ মনে করব। আসুন, বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এবং উগ্রবাদী সমালোচনা বহিষ্কার করে দেশের কল্যানে এগিয়ে চলি।'
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন